G A S O N L I N E

Since 2003

#Gasonline

Home Discover Institutions Contact Us
Class Notes New Notes Apply online Admission 2025 Online Fees Payment
বঙ্কিমচন্দ্রের কলমে নারী: সাহিত্যিক রেঁনেসাঁর এক অভূতপূর্ব সূচনা

ঊনবিংশ শতকের ভারতবর্ষ ছিল পুরুষতান্ত্রিক রীতিনীতির এক কঠিন দুর্গ, বিশেষত বাঙালি সমাজ ছিল, এক তীব্র রক্ষণশীলতার আবরণে মোড়া । নারী তখন গৃহস্থালির ছায়ায় আবদ্ধ এক নীরব সত্তা,- শিক্ষা, মতপ্রকাশ বা সামাজিক অংশগ্রহণের অধিকার থেকে বঞ্চিত। এই বাস্তবতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কলম যেন ছিল বিদ্রোহের একটি দীপ্ত তরবারি। বাংলা উপন্যাসে নারীকে কেবল প্রেমিকা বা কাব্যিক সজ্জা করে না রেখে, তিনি তাঁকে সৃষ্টি করলেন বোধ, শক্তি ও আত্মপরিচয়ের আধার - যা ছিল সেই সময়েএকেবারে নতুন, সাহসী ও বিপ্লবী এক সাহিত্যিক রেঁনেসাঁ।

বঙ্কিমচন্দ্র  কেবল রোম্যান্টিক বা ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখেননি, তিনি নিজের সাহিত্যে গেঁথেছেন সমাজের ভাঙন ও নবজাগরণের সুর। তাঁর নারী চরিত্র -নির্মাণও ছিল একই সূত্রে বাঁধা। নারীকে গৃহকোণে আবদ্ধ না রেখে, সমাজের কেন্দ্রীয় চরিত্র করে তুলেছেন। তাঁর সৃষ্টি তে নারী যেন নিজস্ব মতাদর্শ, আত্মশক্তি ও তীক্ষ্ণ প্রজ্ঞার মূর্ত প্রতীক।

 উপন্যাসে নারী -গৃহিণী থেকে পথপ্রদর্শক : নিঃশব্দতার যুগে এক সাহসী উচ্চারণ

 ১. দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫): নারীচরিত্রের সাহসী আত্মপ্রকাশ

এই উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র নারীদের কেবল প্রেমের অবলম্বন হিসেবে দেখাননি—তাঁরা সাহসী, বুদ্ধিমতী, সিদ্ধান্তগ্রহণে সক্ষম। তিলোত্তমা ও আয়েশা—দুজনেই তাঁদের নিজস্ব অবস্থান থেকে সমাজের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। দুর্গেশনন্দিনী শুধু বাংলা সাহিত্যের সূচনা নয়, এটি এক সামাজিক বিপ্লবের সূচনাও। নারীর সম্ভাবনা, আত্মমর্যাদা ও ভালোবাসার শক্তিকে বঙ্কিমচন্দ্র যেভাবে তুলে ধরেছেন, তা আজও পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করে।

২. কপালকুণ্ডলা(১৮৬৬): এক অরণ্যবাসিনী নারীর স্বাধীনতা-সন্ধান

কপালকুণ্ডলা চরিত্রটি নারীর সেই রূপ, যে নিজের ভালোবাসা, পছন্দ, এমনকি জীবনমৃত্যুর সিদ্ধান্তেও নিজস্ব যুক্তিবোধে চলে। গৃহজগৎ তার কাছে এক 'অচেনা শৃঙ্খল'। বঙ্কিম  এই চরিত্রের মাধ্যমে দেখান নারী চাইলে সমাজের বিধি-নিষেধ ভেঙে নিজেকে চিনে নিতে পারে।

৩. রজনী (১৮৭৭): অন্ধত্বে নয়, অন্তর্দৃষ্টিতে নারী

রজনী শারীরিকভাবে দৃষ্টিহীন হলেও বঙ্কিম  তাঁর মধ্যে এমন এক গভীর বোধ ও আত্মশক্তি স্থাপন করেন, যা সমাজের তথাকথিত সুস্থদৃষ্টির মানুষের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন ও সংবেদনশীল। নারী মানেই দুর্বলতা - এই ধারণার মূলে আঘাত হানে রজনী।

 ৪. রাজসিংহ (১৮৮২): পদ্মিনী ও সীতা - আত্মপরিচয়ের দ্বৈত প্রতিমা

এই উপন্যাসে পদ্মিনী এক ধরণের রাজনৈতিক সচেতন নারীর প্রতীক। সীতা, আরেক নারীচরিত্র, কেবল প্রেমিকা নন - তিনি বিদ্রোহিনী, স্ব চিন্তনে স্বয়ম্ভুতা। পুরুষের সিদ্ধান্তে নয়, নিজের চিন্তা ও নীতির ওপর ভিত্তি করে তাঁরা জীবন গড়েন।

৫. আনন্দমঠ (১৮৮২): ভারতমাতা ও নারী

‘বন্দেমাতরম্’ ধ্বনি যাঁর কলমে জন্ম নেয়, সেই বঙ্কিম  ভারতমাতার ভাবনাকে এক নারীমূর্তি হিসেবে স্থাপন করেন। ‘আনন্দমঠ’-এর শান্তা বা মাতৃমূর্তি সরাসরি নারীর জাতীয়তাবাদী রূপকে তুলে আনে। বঙ্কিম ভারতমাতার যে মূর্তি রচনা করেন, তা আদতে এক নারীমূর্তি - সংহারিণী, সৃষ্টিশীলা, মাতৃত্বের রূপে জাতিকে আহ্বান জানানোর শক্তি। বঙ্কিম প্রথম সেই চিন্তার বীজ রোপণ করেন যেখানে নারী মানেই মাতৃভূমি, আর মাতৃভূমি মানেই চেতনার উৎস।

৬ দেবী চৌধুরাণী (১৮৮৪) : নারীচরিত্রের সাহসী আত্মপ্রকাশ

দেবী চৌধুরাণী বঙ্কিমের সৃষ্ট এক বিপ্লবী নারীচরিত্র প্রফুল্ল, যিনি  একসময় সমাজচ্যুত, স্বামীর ঘর থেকে বিতাড়িত এবং পরবর্তীতে  গৃহবধূ থেকে পরিণত হন স্বাধীনচেতা দস্যুদলের নেত্রীতে। ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর সক্রিয় যোগদান তাঁকে শুধু কাহিনির নায়িকা নয়, এক রাজনৈতিক প্রতীকে রূপ দেয়। তিনি যুদ্ধ করেন, শাসন করেন, আবার শেষপর্যন্ত আত্মোৎসর্গ করে ফিরে আসেন আত্মিক ধার্মিকতার পথে। এই দ্বৈত চরিত্র- একদিকে বিদ্রোহী, অন্যদিকে শুদ্ধ ভারতীয় নীতির ধারক - তাঁকে একটি পূর্ণাঙ্গ রেনেসাঁ-নারীতে পরিণত করে।

৭. Rajmohan’s Wife (১৮৬৪) : মাতঙ্গিনীর নীরব বিদ্রোহ

বাংলা সাহিত্যের প্রথম ইংরেজি উপন্যাস ‘Rajmohan’s Wife’-এ মাতঙ্গিনী চরিত্রটি সাহস, আত্মপ্রত্যয় ও নৈতিক দৃঢ়তার প্রতীক। স্বামীর দমনমূলক আচরণের বিরুদ্ধে চুপ করে না থেকে, তিনি সমাজের ভয় উপেক্ষা করে অন্য পুরুষের কাছে সাহায্য চান, সত্যকে রক্ষা করতে চেষ্টারত থাকেন।

ঐ সময়ে একজন বিবাহিত নারীকে এমন স্বাধীন ও নৈতিকভাবে আত্মনির্ভরভাবে দেখানো ছিল অভূতপূর্ব। মাতঙ্গিনী হলেন সেই নারী, যিনি সমাজের চোখে পাপী হতে পারেন, কিন্তু নিজের বিবেকের কাছে অপরাধী নন। তাঁর এই সাহসিকতা ও আত্মপ্রত্যয় তাঁকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম “new woman” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ।

 

সমসাময়িক লেখক এবং বঙ্কিম চন্দ্রের বৈপ্লবিকতা :

রবীন্দ্রনাথ নারীর সূক্ষ্ম মানসিকতা চিত্রণে পটু হলেও, তিনি মূলত কাব্যিক ও গৃহভিত্তিক জগতে নারীকে দেখেন। শরৎচন্দ্র নারীর প্রতি সহানুভূতিশীল হলেও তাঁদের আত্মপ্রতিষ্ঠার জায়গায় বঙ্কিমের মতো একেবারে শুরু থেকেই তাঁকে আত্মনির্ভর, আদর্শনিষ্ঠ করে তোলেননি। এই জায়গায় বঙ্কিম  সময়ের অনেক আগেই এক নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন।

বঙ্কিম চন্দ্র বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির মুক্তি নারীশক্তিকে উদ্ভাসিত না করে সম্ভব নয়। তাঁর উপন্যাসে নারী তাই কখনও প্রেমিকা, কখনও বীর, কখনও মাতা — কিন্তু সবসময়েই তিনি চেতনার মূর্তি। তাঁর লেখনী তে নারীকে নিয়ে বাংলা সাহিত্যে প্রথম এক আলোকপ্রবাহ বহমান হয়, যা সমাজের অন্ধ গুহাকে আঘাত করেছিল। তাঁর সাহিত্যে নারী শুধু চরিত্র নয়,  এক আদর্শ — এক নবজাগরণের মূর্ত প্রতীক।

 আজকের নারীবাদী চিন্তায় দাঁড়িয়ে, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহসী সৃষ্টিগুলি একইরকম প্রাসঙ্গিক, প্রেরণামূলক এবং নতুন করে প্রণিধানযোগ্য ।

 

সঞ্চিতা রায়চৌধুরী

Related Post

blog
DIGITAL VIOLENCE IS REAL VIOLENCE ...

Every year, the International Day for the Elimination of Violence Against Women reminds us of the urgent need to confront the many forms of abuse women face. While physical violence often dominates headlines, there is another insidious form of harm that thrives in silence and invisibility: digital violence. Online abuse, harassment, and cyber-stalking are not “virtual problems.” They are real violence with devastating consequences.

blog
She Smiled Through A Storm A Daughter s Voice on ...

She taught me to smile through storms; and today, her courage becomes my message to the world. On Cancer Awareness Day, I write in her memory, and for every life that deserves an early chance and lasting hope.

blog
Midnapore Where Freedom Forged its Fire ...

When India’s independence story is told, Delhi’s political negotiations and Calcutta’s big rallies dominate the script. Yet far from the spotlight, Midnapore, now Purba and Paschim was a place where freedom was not a slogan but a lived dangerous commitment. Here, in dusty village lanes and small-town hideouts, people fought in ways that history books found too raw to celebrate.

Midnapore’s struggle was uncompromising. British reports called it “one of the most violent districts” due to political assassinations, sabotage, and underground networks. Colonial accounts painted the rebels as “terrorists,” while post-independence narratives leaned heavily on the Gandhian path, leaving these fighters unmentioned or misrepresented.

Leave a Comment